সূচি শিল্প বা নকশি কাঁথা এক সময়ে গ্রাম বাংলার পল্লী সমাজের মূল স্তম্ভ ছিল। কয়েক শত বছর ধরে গ্রাম বাংলার নারীরা তাদের মনের চিত্র ফুটিয়ে তোলেন এই নকশি কাঁথার মাধ্যমে। আগে এই সূচি মূলত ব্যবহার হতো কাঁথার উপর। বর্তমানে তা এখন শাড়ি,ওড়না,কুর্তি,টপ,পাঞ্জাবি ইত্যাদি নানান পোশাকের উপর করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে কাঁথা স্টিচের কাজ সবথেকে বেশি দেখা যায় বীরভূম জেলায়। তবে এই জেলার নানুর এলাকাটি বেশি বিখ্যাত এই শিল্পের জন্য। নানুর মূলত ইতিহাস প্রসিদ্ধ এলাকা । এখানে খ্রিস্টীয় চতুদর্শ শতাব্দীতে কবি চন্ডীদাস জন্মগ্রহণ করে। নানুর বীরভূম জেলার দক্ষিণ-পূর্বে অজয় নদীর মিলিত অববাহিকায় অবস্থিত। বোলপুর স্টেশন থেকে প্রায় ১৮ কিমি অর্থাৎ এক ঘণ্টার পথ এই নানুর।
কাঁথা হল গ্রাম বাংলার (বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ) হাতে সেলাইয়ের কাজ করা বস্ত্র। আগের দিনে পুরনো কাপড়ের পরত দিয়ে কাঁথা তৈরি করা হত। প্রধানত শয্যাকালে গাত্র আস্বাদন হিসেবে এটি ব্যবহার হত। কাঁথায় যদি নকশার কাজ করা থাকত তবে তাকে নকশি কাঁথা বলা হত। যদিও ইদানিং নকশি কাঁথার পরিবর্তন দেখা গিয়েছে।
বর্তমানে কোন কাপড়ের উপর হাতের কাজ করাকে নকশী কাঁথা বলা হয়ে থাকে। একটি নকশী কাঁথা তৈরি করতে এক মাস থেকে তিন মাস সময় লেগে থাকে। একেকটি নকশী কাঁথার বিভিন্ন ধরনের তাই বিভিন্ন রকম দাম ও সময় লেগে থাকে। এর দাম প্রায় ২০০ টাকা থেকে ৮০০০ টাকার মধ্যে থাকে।
পল্লী কবি জসীমউদ্দীন এই নকশি কাঁথা নিয়েই ১৯২১ সালে 'নকশি কাঁথার মাঠ' কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। তবে ৫০০ বছর আগে কৃষ্ণদাস কবিরাজ রচিত শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত বইয়ে কাঁথার কথা সবার প্রথম পাওয়া যায়। এই নকশি কাঁথা ফোঁড় দেওয়ার নৈপুণ্যর গুণে এতেই বিচিত্র বর্ণের নকশা তরঙ্গ ও বয়ন ভঙ্গির প্রকাশ ঘটে নকশার সাথে মানানোর জন্য বা নতুন নকশার জন্য কাঁথার ফোঁড় ছোট বা বড় করা হয়।
এই নকশী কাঁথার ডিজাইন বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে তার মধ্যে কয়েকটি উদাহরণ স্বরূপঃ-
পাড়তোলা কাঁথা: এই কাঁথা পুরোটাতেই শাড়ির পাড়ের মতো নকশা করা থাকে তাই একে পাড়তোলা কাঁথা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
রুমাল কাঁথা: সাধারণত এক বর্গফুট আকারের হয়।প্রধানত এটি আমরা রুমাল হিসেবে ব্যবহার করে থাকি। তাতে নকশী কাঁথার বিভিন্ন রকমের ডিজাইন করা থাকে।
আসন কাঁথা: বসার কাজে ব্যবহৃত হয় এই আসন কাঁথা।
দস্তরখানা: খাবার সময় মেঝেতে পেতে তার ওপর খাবার ও বাসনপত্র রাখা হয় এই দস্তরখানায়।
নকশি কাঁথা ধরণ
নকশি কাঁথা সেলাইয়ের কোন নির্দিষ্ট নকশা নেই। যিনি সেলাই করেন তার মনে যা আসে তাই তিনি সেলাই করেন। সূর্য, চাঁদ, গাছ, পাখি, মাছ, ফল, ময়ূর সহ বিভিন্ন নকশা করা হয়। তবে সেলাইয়ের ধরন অনুযায়ী কয়েকটি প্রকারভেদ আছেঃ-
লহরী: লহরী এসেছে পারস্য শব্দ থেকে। লহর মানে হল ঢেউ। ঢেউ খেলানো সেলাইকে লহরী কাঁথা বলা হয়ে হয়।
বাঁকা সেলাই: এই কাঁথা তৈরি হয় ব্রিটিশ আমলে।
সুজনি কাঁথা: সাধারণত এই কাঁথায় ঢেউ খেলানো ফুল ও লতাপাতার নকশা করা থাকে তাই একে সুজনি কাঁথা বলা হয়ে থাকে।এই নকশি কাঁথা বা কাঁথা স্টিচ নিয়ে দুই ধরনের ব্যবসা করতে যায় । এক নম্বর হল আপনি এটি নিজে প্রশিক্ষণ নিয়ে কারখানা গড়ে তুলতে পারেনা। আবার পাইকারি দামে মাল থেকে কিনে নিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ব্যবসা করতে পারেন।
যদি প্রশিক্ষণ নিতে চান তবে আপনাকে নানুরের গোপডিহিতে এক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে যেখানে বিনা পয়সায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তবে শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য এই প্রশিক্ষণটি প্রযোজ্য।
নকশী কাঁথার দাম
এর দাম বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে, বিভিন্ন রকম কাপড়ের জন্য। আপনি ওড়না ২০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে পেয়ে যাবেন। বাচ্চাদের পাঞ্জাবি ২৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে। সিল্ক শাড়ির প্রতিটি নকশি করা থাকে, দাম প্রায় ২৫০০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকার মধ্যে পেয়ে যাবেন। আর সুতি কাপড়ের উপর কাঁথা স্টিচ পাবেন ৪০০০ টাকা থেকে ৮০০০ টাকার মধ্যে। কুর্তি পেয়ে যাবেন আপনি ২৫০ টাকা থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে। বড়োদের পাঞ্জাবি প্রায় ৪০০ টাকা থেকে ১৫০০ টাকার মধ্যে পেয়ে যাবেন।

No comments:
Post a Comment